18/12/2024
“১৯৮৪: যখন ভাবনাও অপরাধ”
একটা পৃথিবী কল্পনা করো, যেখানে তোমার চিন্তাও সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এমনকি মনের ভেতর শাসনের বিরুদ্ধে কথা ভাবলেই সেটা হবে অপরাধ। সেই পৃথিবী নিয়েই লেখা হয়েছে জর্জ অরওয়েলের ‘১৯৮৪’। গল্পটা উইনস্টন স্মিথ নামের এক সাধারণ মানুষকে নিয়ে, যে তার শাসকদের অন্যায় আর ক্ষমতার লোভের মধ্যে নিজের স্বাধীনতা খুঁজতে চায়।
উইনস্টন স্মিথ কাজ করে ‘দল’ নামের এক স্বৈরশাসক সরকারের অধীনে। সে ইতিহাস মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী। তার কাজ হলো পুরোনো রেকর্ড পাল্টে ফেলা, যাতে দল যা বলছে, সেটাই সত্যি মনে হয়। দল আজ যা বলছে, সেটা সত্য। কাল যদি সেটাই বদলে যায়, তাহলে বদলানোর দায়িত্ব উইনস্টনের।
এই সমাজে সবাইকে শাসন করে বিগ ব্রাদার। এক রহস্যময় নেতা, যাকে কেউ কখনো দেখে না, কিন্তু তার উপস্থিতি সর্বত্র। প্রতিটি বাড়িতে টেলিস্ক্রিন বসানো, যা শুধু তোমার কথা শোনে না, তোমাকে দেখে, তোমার প্রতিটি নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করে। যদি কারও মুখে শাসনের প্রতি সন্দেহের ছাপ দেখা যায়, তাকেও শাস্তি পেতে হয়। এমনকি মনের ভেতরও কোনো প্রশ্ন উঠলেই সেটা ‘ভাবনা-অপরাধ’।
উইনস্টন জানত, সবকিছু ভুল হচ্ছে। কিন্তু এমন সমাজে নিজের মতামত প্রকাশ করা মানেই মৃত্যুর ডাক। একদিন, অফিসে কাজ করার সময়, সে জুলিয়া নামের এক সহকর্মীর প্রেমে পড়ে। তাদের প্রেম এখানে বেআইনি, কারণ সরকার চায়, মানুষ শুধু বিগ ব্রাদারকে ভালোবাসুক।
উইনস্টন আর জুলিয়া লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করতে থাকে। তারা নিজেদের মতো একটা ছোট্ট দুনিয়া তৈরি করে। তারা শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু এই সমাজে কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। এমনকি যে মানুষকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো, সেও হতে পারে তোমার সর্বনাশের কারণ।
একদিন, তারা ধরা পড়ে যায়। সরকারের গুপ্তচর তাদের সন্ধান পেয়ে যায়। উইনস্টন আর জুলিয়াকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় মন্ত্রণালয়ের রুম ১০১-এ। এখানে বন্দিদের তাদের সবচেয়ে বড় ভয়ের মুখোমুখি হতে হয়। উইনস্টনের ভয় ছিল ইঁদুর। তার সামনে একটা খাঁচায় ইঁদুর এনে রাখা হয়, বলা হয়, “তোমার মুখে এই ইঁদুরগুলো ছেড়ে দেওয়া হবে।”
ভয়ে উইনস্টনের মানসিক প্রতিরোধ ভেঙে যায়। সে নিজের প্রেমিকা জুলিয়ার নাম বলে দেয়। সে বলে, “আমাকে ছেড়ে দাও, ওকে শাস্তি দাও!” এই এক কথাতেই উইনস্টন হেরে যায়।
উইনস্টনকে শেষ পর্যন্ত ছেড়ে দেওয়া হয়। সে আবারও সমাজে ফিরে আসে। কিন্তু সে আর আগের উইনস্টন নয়। তার সব চিন্তা, সব বিশ্বাস মুছে ফেলা হয়েছে। এখন সে শুধু বিগ ব্রাদারকেই ভালোবাসে।
১৯৮৪ আমাদের একটা ভয়ঙ্কর পৃথিবী দেখায়, যেখানে স্বাধীনতা আর ভালোবাসার কোনো স্থান নেই। যেখানে সরকার শুধু মানুষের শরীর নয়, তার মনের দখল চায়।
এই গল্প আমাদের শেখায়, প্রশ্ন না করলে, নিজের অধিকার না বুঝলে, একদিন হয়তো আমাদেরও জীবনের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে এমন কোনো বিগ ব্রাদার।
“যদি তুমি স্বাধীনতা হারাও, তবে তুমি কে? তোমার নিজের চিন্তাও কি তোমার থাকবে?”