04/10/2025
"এসেছিলাম আগন্তুক হয়ে, যাচ্ছিও আগন্তুক হয়েই"
- মৃত্যুশয্যায় লেখা এক চিঠিতে আরঙ্গজেব
Aurangzeb – The Man and the Myth by Audrey Truschke
আরঙ্গজেব -দ্য ম্যান অ্যান্ড দ্য মিথ — ইতিহাসের আলো ও অন্ধকারে এক সম্রাটের পুনর্মূল্যায়ন
ইতিহাসবিদ অড্রি ট্রাস্কে তাঁর বই Aurangzeb "The Man and the Myth”-এ সাহসের সঙ্গে উন্মোচন করেছেন মোগল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় — সম্রাট আরঙ্গজেব আলমগীরের জটিল জীবন ও রাজনীতি। নিখুঁত গবেষণা ও প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণে তিনি দেখিয়েছেন, কল্পকথা ও বাস্তব ইতিহাসের মধ্যে কত বিশাল ব্যবধান।
ট্রাস্কে গোপন করেননি আরঙ্গজেবের নিষ্ঠুর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার লড়াই—নিজ ভাইদের হত্যা, বিশেষত দারাশিকোহের মৃত্যুদণ্ড, তাঁর কঠোর শাসননীতি ও অনমনীয় চরিত্র সবই ইতিহাসে লিপিবদ্ধ। কিন্তু লেখিকা এখানেই থেমে থাকেননি। তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই নির্মমতার পেছনের মানুষটিকে—যিনি ছিলেন ধর্মপ্রাণ, শৃঙ্খলাপরায়ণ, এবং নিজের নৈতিক দায়বদ্ধতায় গভীরভাবে বিশ্বাসী।
তিনি দেখিয়েছেন, আরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে হিন্দু বিদ্বেষের অভিযোগের পেছনেও রয়েছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা। কিছু মন্দির ধ্বংসের ঘটনা সত্য হলেও, তিনি তাঁর দরবারে আগের যেকোনো মোগল সম্রাটের চেয়ে বেশি সংখ্যক হিন্দু কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন এবং বহু মন্দির ও পণ্ডিতকে অনুদানও দিয়েছিলেন।
আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহী মতবাদকে প্রত্যাখ্যান করে আরঙ্গজেব ইসলামি নীতিতে অবিচল ছিলেন, কিন্তু তাঁর ধর্মভিত্তিক শাসন ছিল নৈতিকতার শাসন, উগ্রতার নয়।
অড্রি ট্রাস্কে ইতিহাসের একপাক্ষিক প্রচার ও উপনিবেশিক ব্যাখ্যাকে ভেঙে দিয়েছেন, তুলে ধরেছেন এক বাস্তব, মানবিক ও জটিল আরঙ্গজেবকে -যিনি একই সঙ্গে পণ্ডিত, কৌশলী ও বিতর্কিত শাসক।
যে পাঠক সত্য ইতিহাস জানতে চান, এই বই তাঁদের জন্য
এই বইটি আপনি কফি খেতে খেতে পড়তে পারবেন
রাজবাড়ী রিপাবলিকে ।
PS: আমার কাছে মনে হয়েছে আরঙ্গজেবের পরিবর্তে যদি দারাশিকো মোগল সাম্রাজ্যের প্রধান হতেন তবে ভারতবর্ষের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো !
আরঙ্গজেবের ভাই দারাশিকো ছিলেন এক বিস্ময়কর মানুষ — একদিকে রাজপুত্র, অন্যদিকে দার্শনিক, সুফি ও কবি। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সত্য একটাই, কেবল তার পথে ভিন্নতা রয়েছে। এই ধারণাই তাঁকে সুফিবাদের পথে নিয়ে আসে ।
দারাশিকো ছিলেন মিয়ান মির ও পরে মুল্লা শাদ্দা লাহোরি-র শিষ্য। তিনি মনে করতেন, ইসলাম ও হিন্দুধর্ম — উভয়ের মর্ম একই; কেবল ভাষা ও প্রতীক আলাদা।
এই চিন্তার ফলেই তিনি রচনা করেন বিখ্যাত গ্রন্থ “মজমা-উল-বাহরাইন” (Majma-ul-Bahrain, অর্থাৎ দুই সাগরের মিলন ) — যেখানে তিনি ইসলামের সুফি দর্শন ও হিন্দু উপনিষদের তত্ত্বের মধ্যে গভীর সাদৃশ্য তুলে ধরেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, তিনি নিজে উপনিষদগুলো ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন, নাম দেন “সির-এ-আকবর” (The Great Secret) যা পরে ইউরোপীয় চিন্তাবিদদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়।
তাঁর কবিতায় ছিল প্রেম, জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক মিলনের সুর। তাঁর অন্যতম কাব্যগ্রন্থ “দেওয়ান-এ-দারা শিকোহ”-এ সুফি ভাবনা ও মানবপ্রেম একাকার হয়ে যায় ।
"আমি সেই প্রেমের খোঁজে, যা ধর্মের ভাষা জানে না,
আমি সেই সত্তার তৃষ্ণায়, যেখানে আল্লাহ আর ঈশ্বর এক হয়ে যায়।”
তাঁর এমন উদার ভাবনা ও ধর্মীয় সংলাপের চেষ্টা মোগল দরবারে অনেকের বিরাগ সৃষ্টি করে, বিশেষত তাঁর ভাই আরঙ্গজেবের যিনি ইসলামী শাসনের শৃঙ্খলাকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দিতে চাননি।
Naseem Shafi Rajbari Republic